১. অনার্য জনগোষ্ঠী
নেগ্রিটো
অস্ট্রিক
দ্রাবিড়
মঙ্গোলীয়
২. আর্য জনগোষ্ঠী
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাঙ্গালীদের সবচেয়ে প্রাচীন পূর্বপুরুষ হলো নেগ্রিটোরা। বর্তমানে সাঁওতাল, ভীল, মুণ্ডা, হাড়ি, চণ্ডাল ও ডোম উপজাতিকে নেগ্রিটোদের উত্তরসূরী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিশেষ করে সুন্দরবন, ময়মনসিংহ ও যশোর অঞ্চলে এদের প্রভাব লক্ষ্যণীয়।
নেগ্রিটো (Negrito) হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আদিম জনগোষ্ঠী। ‘নেগ্রিটো’ শব্দটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘ক্ষুদ্র নিগ্রো’। নৃবিজ্ঞানে এটি একটি নৃতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরা মূলত আফ্রিকা থেকে আগত আধুনিক মানুষের (Homo sapiens) প্রাচীন অভিবাসী গোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা হাজার হাজার বছর আগে এশিয়ায় এসে স্থানীয় পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হয়।

নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রধানত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল ও দ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। ফিলিপাইনসের আয়তা ও আগতা, ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জারাওয়া, সেন্টিনেলিজ ও গ্রেট আন্দামানিজ এবং মালয় উপদ্বীপের সেমাং জনগোষ্ঠী নেগ্রিটোদের অন্তর্ভুক্ত। বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এলাকায় বসবাসের ফলে এরা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
শারীরিকভাবে নেগ্রিটোরা খর্বাকৃতি, গাঢ় চামড়াবর্ণ এবং কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী। সাধারণত পুরুষদের উচ্চতা ১৪০–১৫০ সেমি এবং নারীদের ১৩০–১৪৫ সেমি হয়ে থাকে। এদের এই বৈশিষ্ট্য বনজীবনের সাথে অভিযোজিত, যা চলাচল সহজ করে এবং কম শক্তি ব্যয়ে জীবনধারণে সহায়তা করে।
জীবনযাত্রার দিক থেকে নেগ্রিটোরা ঐতিহ্যগতভাবে শিকারী-সংগ্রাহক সমাজ। শিকার, মাছ ধরা ও ফলমূল সংগ্রহই তাদের প্রধান জীবিকা। সমাজব্যবস্থা ছোট ও সমতাভিত্তিক, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ধারণা নেই। ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা প্রকৃতি ও আত্মাপূজার প্রতি আস্থাশীল।
মানব ইতিহাসে নেগ্রিটোদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত উপমহাদেশে প্রাচীন ও মধ্য প্রস্তরযুগের সংস্কৃতি বিকাশে এদের অবদান রয়েছে। তবে আধুনিক সভ্যতার বিস্তার, বন উজাড় ও বহিরাগত আগ্রাসনের ফলে বর্তমানে নেগ্রিটো জনগোষ্ঠী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে
অস্ট্রিক জাতি হলো অনার্য জনগোষ্ঠী । বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে অস্ট্রিক জাতি থেকে। অস্ট্রিক জাতির আরেক নাম 'নিষাদ জাতি’। প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে এরা ইন্দোচীন থেকে আসাম হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে। নেগ্রিটোদের উৎখাত করে সিন্ধু-বিধৌত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।
প্রোটো-অস্ট্রালয়েড: নৃ-তাত্ত্বিক পরিভাষায় এদের প্রোটো-অস্ট্রালয়েড (Proto-Australoid) বলা হয়।
কৃষি ও খাদ্যাভ্যাস (সভ্যতায় অবদান)
কৃষিভিত্তিক সমাজ: অস্ট্রিকদের সভ্যতা ছিল সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর। তারা লাঙল ব্যবহার করে কৃষিকাজ করত।
চাষাবাদ: তারাই প্রথম কলা, নারিকেল, সুপারি, পান, আদা, হলুদ, বেগুন ও লাউ চাষের প্রচলন করে।
অন্যান্য দক্ষতা: তারা সুতি বস্ত্র বয়ন।
ভাষা ও সমাজ ব্যবস্থা
বাংলায় শব্দের প্রভাব: বর্তমান বাংলা ভাষার অনেক শব্দ (যেমন—কুড়ি, গণ্ডা, পন, লাঙল, মরিচ, কার্পাস, তাম্বুল) অস্ট্রিক ভাষা থেকে এসেছে।
বর্তমান উত্তরসূরি: বাংলাদেশের সাঁওতাল, মুণ্ডা, কোল ও খাসিয়া উপজাতিরা এই অস্ট্রিক গোষ্ঠীর উত্তরসূরি।
সমাজ কাঠামো: এদের সমাজে পঞ্চায়েত প্রথার প্রচলন ছিল বলে ধারণা করা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তর তামিল জনগোষ্ঠী দ্রাবিড়দের উত্তরসূরী। সিন্ধুর হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতার স্রষ্টা দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী। দ্রাবিড়রা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করে। দ্রাবিড়রা অস্ট্রিকদের উপর প্রভাব বিস্তারের ফলে উত্তরের সংমিশ্রনে গড়ে উঠে বাঙ্গালী জাতির সিংহভাগ।
পরিচিতি ও আদি বাসস্থান:
দ্রাবিড়রা হলো ভারতের অন্যতম প্রাচীন এবং আদিম জনগোষ্ঠী।
অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তারা মধ্য এশিয়া বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারতে এসেছিল। তবে আধুনিক গবেষণায় তাদের ভারতের ভূমিপুত্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
সিন্ধু সভ্যতা ও দ্রাবিড় সম্পর্ক:
অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার (Indus Valley Civilization) স্রষ্টা ছিলেন দ্রাবিড়রা।
আর্যদের আগমনের ফলে তারা উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতে সরে যেতে বাধ্য হয়।
ভাষা ও ভাষাগোষ্ঠী:
দ্রাবিড়দের প্রধান ভাষা চারটি: তামিল, তেলুগু, কন্নড় এবং মালয়ালম।
এদের মধ্যে তামিল সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে প্রচলিত ব্রাহুই (Brahui) ভাষাকে দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়, যা তাদের আদি বিস্তারের প্রমাণ দেয়।
নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:
নৃতত্ত্বের ভাষায় দ্রাবিড়রা সাধারণত 'অস্ট্রালয়েড' বা 'মেডিটেরানিয়ান' (ভূমধ্যসাগরীয়) নরগোষ্ঠীর মিশ্রণ।
তাদের গায়ের রং কালো, চুল কোঁকড়ানো এবং নাক প্রশস্ত হয়ে থাকে।
সমাজ ও ধর্ম:
দ্রাবিড় সমাজব্যবস্থা মূলত মাতৃতান্ত্রিক ছিল (যদিও কালক্রমে তা পরিবর্তিত হয়েছে)।
তারা লিঙ্গ পূজা এবং বৃক্ষ পূজায় বিশ্বাসী ছিল, যা পরবর্তীকালে হিন্দু ধর্মের শিব ও শক্তির ধারণার সাথে মিশে যায়।
স্থাপত্য ও সংস্কৃতি:
দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্যের বিশেষ রীতিকে বলা হয় 'দ্রাবিড় স্থাপত্য শৈলী' (Dravidian Style)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উঁচু 'গোপুরম' (প্রবেশদ্বার) এবং পিরামিড আকৃতির 'বিমান'।
বাংলায় দ্রাবিড় প্রভাব:
বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক গঠনে দ্রাবিড়দের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের অনেক জায়গার নাম (যেমন- শেষে 'দহ', 'গুড়ি', 'জুড়ি' যুক্ত নাম) দ্রাবিড় প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মঙ্গোলীয়রা (Sino- Tibetan) ইন্দোচীন হতে আগমন করে। কালের বিবর্তনে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয় জাতির ত্রি-সংমিশ্রণ ঘটে। ত্রিপুরা, চাকমা, গারো, কোচ, ইত্যাদি এই গোষ্ঠীভুক্ত।
উৎস ও বিস্তৃতি: মঙ্গোলীয়রা প্রধানত পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর এশিয়ার অধিবাসী। তবে আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসীরাও (রেড ইন্ডিয়ান) এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য:
গায়ের রং: সাধারণত হলদেটে বা তামাটে বর্ণের হয়।
চোখ: এদের চোখের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এপিক্যানথিক ফোল্ড (Epicanthic fold), যার কারণে চোখ কিছুটা ছোট বা তির্যক দেখায়।
চুল: সাধারণত সোজা, কালো এবং শক্ত হয়।
নাক: চ্যাপ্টা বা মাঝারি এবং নিচু নাসিকা থাকে।
মুখমণ্ডল: গালের হাড় (Cheekbones) চওড়া ও উঁচু হয়।
বাংলাদেশে মঙ্গোলীয় গোষ্ঠী: বাংলাদেশের অধিকাংশ উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। যেমন: চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা, ও সাঁওতাল (সাঁওতালদের মধ্যে অস্ট্রিক প্রভাব বেশি থাকলেও মঙ্গোলীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান)।
শাখা: এদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
উত্তর মঙ্গোলীয়: (যেমন- চীনা, মঙ্গোলীয়, জাপানি, কোরীয়)।
দক্ষিণ মঙ্গোলীয়: (যেমন- মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের উপজাতিরা)।
আর্য হচ্ছে একটি প্রাচীন জাতিবিশেষ, যার অর্থ সর্বংশজাত ব্যক্তি। আর্যদের আদিনিবাস ছিল ইউরাল পর্বতের দক্ষিণে বর্তমান মধ্য এশিয়া- ইরানে। প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে খাইবার গিরিপথ (আফগানিস্থান-পাকিস্তান) ব্যবহার করে আগমন করে এদেশে। আর্যরা সনাতন ধর্মালম্বী, তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ। বেদ থেকে ঋগ্বেদের সৃষ্টি হয়েছে। আর্য হওয়ার ধারণাটি জাতিগত নয়, বরং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ।
আর্যদের আদি বাসস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতবাদ হলো ইউরাল পর্বতের দক্ষিণে মধ্য এশিয়া বা দক্ষিণ রাশিয়া (ম্যাক্স মুলারের মত)।
ধর্ম ও সাহিত্য
প্রধান ধর্মগ্রন্থ: আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ। এটি চার ভাগে বিভক্ত: ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুঃবেদ ও অথর্ববেদ।
প্রাচীনতম গ্রন্থ: ঋগ্বেদ হলো বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ।
উপনিষদ: বেদের দার্শনিক অংশকে বলা হয় উপনিষদ বা বেদান্ত।
সমাজ ও রাজনীতি
পারিবারিক কাঠামো: আর্য সমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক।
বর্ণপ্রথা: ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের 'পুরুষসূক্তে' প্রথম চতুর্বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) উল্লেখ পাওয়া যায়।
গ্রামের প্রধান: আর্যদের গ্রামের প্রধানকে বলা হতো 'গ্রামণী'।
রাজনৈতিক সভা: আর্যদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিষদ ছিল— সভা (বয়স্কদের নিয়ে) এবং সমিতি (সাধারণ জনগণের নিয়ে)।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা
প্রধান জীবিকা: আর্যদের প্রধান পেশা ছিল পশুপালন এবং দ্বিতীয় প্রধান পেশা কৃষি।
পবিত্র পশু: আর্যরা গরু-কে পবিত্র জ্ঞান করত এবং একে বলা হতো 'অঘ্ন্যা' (যা হত্যাযোগ্য নয়)।
মুদ্রা: আর্যদের মুদ্রার নাম ছিল নিষ্ক ও মনা।
ধাতুর ব্যবহার: আর্যরা প্রথম দিকে তামা ও ব্রোঞ্জ ব্যবহার করলেও পরবর্তী বৈদিক যুগে লোহার ব্যবহার শুরু করে। (সিন্ধু সভ্যতার মানুষ লোহার ব্যবহার জানত না)।
ভৌগোলিক অবস্থান ও নদী
সপ্ত সিন্ধু: আর্যরা প্রথম সিন্ধু নদের অববাহিকায় বসবাস শুরু করে, যা 'সপ্ত সিন্ধু' অঞ্চল নামে পরিচিত।
পবিত্র নদী: ঋগ্বেদে সরস্বতী নদীকে সবচেয়ে পবিত্র নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more